Se 1 · Ep 6 · ষষ্ঠ পর্ব - বন্ধুত্ব
বরাবরের মত একদিন আলেকজান্ডার আর হেফ্যাসটিয়ন রাজমহলের উদ্যানে বসেছিল । আলেকজান্ডার নগ্ন দেহের ওপর একটা স্বর্ণাভ হিম্যাটিয়ন পরেছিল রত্ন খচিত সোনার ব্রোচ যুক্ত, কাঁধের ওপর হালকা ভাবে ঝুলে ছিল, সঙ্গে ছিল স্বর্ণ মণ্ডিত লাইয়র । পাশে বসেছিল হেফ্যাসটিয়ন, শ্বেত চিটোন পরিহিত, রত্ন ও স্বর্ণালঙ্কার ভূষিত; দুজনের মাথায় জলপাই পাতা ও ফুল আর সাদা গোলাপ ফুলের তৈরি মুকুট যা তারা একে ওপরের জন্য তৈরি করেছিল । হেফ্যাসটিয়ন বন্ধু সুলভ ভাবে তার আলেকজান্ডারের উরুর ওপর হাত রাখল, সেই স্পর্শ মন্থনে, মেহনে, প্রাণের নির্যাস প্রবাহিত করে জীবন্ত হয়ে উঠল । ঝরে পড়ছিল তাদের ওপর গোলাপি, সাদা গুচ্ছ গুচ্ছ করবী, জুঁই পুষ্প । মৃদু হাওয়া, বাগানের অসংখ্য ফুলের গন্ধ আর সাথে ভেসে আসছিল এক অস্ফুট সুরের উল্লাসিত তরঙ্গ যা শুধু যাদের শোনার মত কান আছে তারাই শুনতে পায় । একদিন বাগানের একটা চাতালের অভ্যন্তরে দুজন সময় কাটাচ্ছিল । আলেকজান্ডার একই রকম পরিহাস হেফ্যাসটিয়নের সাথে করল, সে তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় নিয়ে এল, তার ডানকাঁধ থেকে কোমরের বাঁদিকে একটা ফিতে দিয়ে পিছনে একটা বস্ত্রের দুই প্রান্ত বেঁধে দিল, বস্ত্রটা পিঠের ওপর দিয়ে ঝোলানো থাকল । চাতালের ভিতর সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল । প্রস্তুত ছিল সেই ফলের রস ও মধু মিশ্রিত পানীয় ।
আলেকজান্ডার -" তোমাকে একদম দেবতা ইরোসের মত লাগছে, খুব সুন্দর ।" সে একটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের চিটোন পরেছিল । হেফ্যাসটিয়ন বলল," আর তোমাকে অ্যাপোলোর মত ।" চিত্রে অ্যাপোলোকে সাধারণত হলুদ ও কমলা রঙের বস্ত্র পরিহিত দেখানো হয় । আলেকজান্ডারের উজ্জ্বল বর্ণে ও হলুদ চিটোন সূর্যের মত দীপ্তিময় দেখাচ্ছিল । সে বলল," তোমার শুধু দুটো ডানার অভাব । মনে হচ্ছে তুমি আমাকে শরবিদ্ধ করেছ !" হেফ্যাসটিয়ন হাসল, তার বন্ধুর কাছে একটা পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর হাসি । কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হল, তারা দুজন চাতালের ভিতর থেকে বৃষ্টি দেখতে থাকল, চারিদিক অস্পষ্ট, জলকণা ধারায় সিক্ত, জলের শব্দে মুখরিত । চাতালের মধ্যে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে, ভেসে আসছে রাত্রিগন্ধার অপূর্ব গন্ধ, স্তম্ভে সাজানো ঝুলন্ত মালা থেকে । হেফ্যাসটিয়নের ঠান্ডা লাগছিল, আলেকজান্ডার পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল, ইচ্ছা করে নিজের ঠান্ডা আঙুল তার নগ্ন গায়ের ওপর চলনা করে শিহরিত করছিল, সে বাধা দিলে তার দুহাত চেপে ধরে মজা করতে থাকল । হেফ্যাসটিয়নের এতে খুশিই হচ্ছিল । ফুলদানি থেকে তার প্রিয় সাদা গোলাপ তুলে এনে তার গায়ের ওপর সঞ্চালন করল । বৃষ্টির মধ্যে চাতালের বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না দুজনকে । কিছুক্ষণ তারা আনন্দে সময় কাটাল, তারপর বৃষ্টি কমে এল । হালকা ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নকে টেনে বাইরে নিয়ে এল, তারা দৌড়ে বেরাল ভেজা মাটি ও ঘাসের ওপর দিয়ে । অস্তমিত সূর্যের স্বর্ণালী আভা ও বিপরীত দিকের নীল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চরাচর আর ওই দুজন কিশোর ।
নগর থেকে দূরে পাহাড়ের উপত্যকায় ভ্রমণে যেত তারা দুজন । বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে অনেক ঘোরাঘুরি করত । তারা হাঁটত, দৌড়াত, খেলত, হাসত, অনেক আনন্দে কাটিয়েছিল তাদের কৈশোর বয়স । হেফ্যাসটিয়ন আলেকজান্ডারকে জিজ্ঞাসা করত," তুমি ভবিষ্যতে কীরকম যোদ্ধা হবে ?" সে প্রত্তুতরে বলত," আমার মা যেরকম চায়, বিশ্বজয়ী সম্রাট, দুর্দম্য, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যার সামনে পুরো দুনিয়া মাথা নত করবে ।" হেফ্যাসটিয়ন দুঃখ পেত আলেকজান্ডারের কথায়, সে জানে মহারানী ওলম্পিয়া স্বভাবে উচ্চাকাঙ্খী, ঈর্ষাপরায়ণ, নৃশংস নারী, সে চাইতো না আলেকজান্ডার তার মায়ের মত হোক । সে নিজেও একজন সাহসী, দৃঢ় মানসিকতার ব্যক্তিত্ব ছিল, তবে তার জন্য সে নির্দয়, হিংস্র কখনও হয়নি ওলম্পিয়ার চিন্তাভাবনার মত । সে একজন উন্নত চরিত্রের, মহৎ হৃদয়ের মানুষ । সে জানত আলেকজান্ডারকে ছেড়ে সে থাকতে পারবে না তাই সবসময় তাকে তাকে সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করত । সে চায় তার বন্ধু বিশ্বজয়ী হোক, কিন্তু কোনও ক্রূর শাসক না, দয়ালু সেবাপরায়ণ নোবল ম্যান হোক ।