Se 1 · Ep 5 · পঞ্চম পর্ব - অ্যাথেনার গর্ভগৃহ
একদিন মীজাতে টেম্পল অফ নিম্ফস্ এ পঠনপাঠন শেষ হওয়ার পর ওরা দুজন গেল শহর অনেক দূরে এক গুহামন্দিরে, গ্রিসের অন্যতম মহান দেবী অ্যাথেনার মন্দির । জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, যুদ্ধ, রণনীতি ও কারুকলার দেবী অ্যাথেনা । বিস্তীর্ণ প্রান্তর পেরিয়ে, পাহাড়ের ঢাল বরাবর উঠে যাওয়া ভগ্ন রাস্তা ও সিড়ি পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেল অ্যাথেনার মন্দিরের প্রাঙ্গনে । বিশাল আকৃতির উচ্চ স্তম্ভ বিশিষ্ট প্রকাণ্ড প্রাসাদের ন্যায় মন্দির । গুহার মুখ প্রবেশদ্বার দুপাশে সুউচ্চ গুহা গাত্র খোদিত প্রস্তর স্তম্ভ, সুন্দর কারুকার্য করা । স্তম্ভ গুলোর গায়ে অনেক স্থানে ফাটল ধরেছে, অনেক অংশ ভেঙে পড়ে গেছে, চারিদিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙা টুকরো, পাথর । তারা মুগ্ধ হল এই প্রাচীন দিব্য সৌন্দর্য্য দেখে, যা জীর্ণ অথচ স্বমহিমায় উজ্জ্বল ভাবে প্রকাশ্যমান । প্রবেশদ্বার থেকে ভিতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন অলিন্দ, দুপাশে সারি দিয়ে ভগ্নপ্রায় অথচ দৃঢ় স্তম্ভ, দেওয়ালের ও ছাদের ফাটল থেকে সূর্যালোক প্রবেশ করছে, এক আলো-অন্ধকার যুক্ত অসাধারণ পরিবেশ । আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নের হাত ধরে দৌড়ে প্রবেশ করল অলিন্দের ভিতর, তারা অবাক হল এই বিশাল, প্রাচীন, সৌন্দর্য্য ও গম্ভীর্যে পূর্ণ প্রাসাদ, ভিতরে গিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দুজন । কিছুদূর গিয়ে গর্ভগৃহ, প্রকাণ্ড বেদির ওপর স্থাপিত অতুল মহিমান্বিতা দেবী অ্যাথেনার সুবিশাল মূর্তি । দেবীর সুন্দর, দিব্য ব্যক্তিত্বময় মুখমণ্ডল, দেহাবয়ব; রাজকীয় পিপলোস পরিহিতা, বুকে অভেদ্য বর্ম, সিংহের মুখাকৃতি ডিজাইন করা, কোমরে কোমরবন্ধ; মাথায় শোভিত রাজকীয় যোদ্ধার ন্যায় শিরস্ত্রাণ; দিব্য অলঙ্কারে সজ্জিতা; বাঁহাতে দীর্ঘ, সুতীক্ষ্ণ শূল, ডানহাতে তালুর ওপর স্থিত ক্ষুদ্রাকৃতি বিজয়ের দেবী; পায়ে শক্ত জুতো । দুপাশে পেঁচা ও সাপ তাঁর দুই প্রতীক । এক পাশে অ্যাথেনার পিতা দেবরাজ জিউস ও তাঁর পত্নী দেবরাজ্ঞী হেরার ভাস্কর্য, এক পাশে তার ভাইবোন সূর্যের দেবতা অ্যাপোলো ও চন্দ্রের দেবী আর্টেমিসের ভাস্কর্য । এক স্থানে খোদিত দেবী অ্যাথেনা ও যুদ্ধের দেবতা অ্যারেসের যুদ্ধের দৃশ্য । অ্যারেস অপর যুদ্ধের দেবতা, কিন্তু ইনি যুদ্ধের সাথে ক্রোধ, হিংসা, ছলনা ও নৃশংসতার সাথে যুক্ত । অ্যাথেনা প্রজ্ঞার দেবী, তাঁর দ্বারা পরাজিত, রথ থেকে পতিত, ধরাশায়ী অ্যারেস; তাঁকে রক্ষা করতে আসা তাঁর প্রেমিকা প্রেম ও সৌন্দর্য্যের দেবী অ্যাফ্রোডাইট ও তাঁদের পুত্র ক্ষুদ্র ডানা যুক্ত শিশু ইরোস । এই সবকিছু এই পাহাড়ের পাথর খোদাই করে নির্মিত । আলেকজান্ডারের বরাবরের প্রিয় দেবী অ্যাথেনা, সে উচ্চ মেধা ও বুদ্ধির অধিকারী, দক্ষ যুদ্ধ শিক্ষার্থী ও জ্ঞানাভিলাষী । দেবী অ্যাথেনাকে সে যথেষ্ট ভক্তি করে, তিনি জিউসের কন্যা, সে জিউসের পুত্র । হেফ্যাসটিয়ন বলল," দেখো উনি তোমার দিদি, তুমি দেবী অ্যাথেনার ভাই !" আলেকজান্ডার মৃদু হাসল । কিছুদূরে এক স্থানে পাহাড়ের গায়ের ফাটল থেকে ঝড়ে পড়েছে ঝরণার ধারা, সূর্যালোকের ক্ষীণ রেখা সেই ধারায় পতিত হয়ে স্বর্ণ বিন্দু ও মুক্তার ন্যায় দৃশ্যমান হচ্ছে । তারা সেই ঝরণার জল পান করল, এ যেন দেবী অ্যাথেনার করুণার ধারা । আলেকজান্ডার খুব খুশি হল এই অদ্বিতীয় স্থান ভ্রমণ করে, তার সাথে হেফ্যাসটিয়নও আনন্দিত । বহু যুগ পর এই প্রাচীন উপাসনালয়ে মানুষের পদ ধ্বনি ধ্বনিত হল । তারা দুজন মহান দেবী অ্যাথেনাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সেই স্থান থেকে ফিরে এল ।
সন্ধ্যার পর তারা মীজায় ফিরে এল । অনেক সময়েই তারা টেম্পল অফ নিম্ফস্ এর ছাত্রাবাসে থাকে । রাত্রে ভোজনের পর আলেকজান্ডার ইলিয়াড পাঠ করছিল, বিখ্যাত গ্রিক কবি হোমারের লেখা কাব্য ইলিয়াড ট্রোজান ওয়ার কেন্দ্র করে লেখা, যার প্রধান দুই চরিত্র অ্যাকিলিস ও প্যাট্রোক্লাস, এরা দুজনও ওদের মত অন্তরঙ্গ বন্ধু, প্রেমিক । হেফ্যাসটিয়ন আলেকজান্ডারের ইলিয়াড পাঠ শুনছিল, তার বরাবরই এটা ভাল লাগে । যুদ্ধে প্যাট্রোক্লাস হেক্টরের হাতে মারা যায়, যাতে গভীর ভাবে শোকাহত হয় অ্যাকিলিস, পরে অ্যাকিলিসের হাতে হেক্টর মারা যায় । ওরা প্যাট্রোক্লাস আর অ্যাকিলিসের পরিণতিতে বারবার দুঃখ বোধ করে । ভবিষ্যতে ওদেরও যোদ্ধা হতে হবে । হেফ্যাসটিয়ন বলল," আচ্ছা ভবিষ্যতে তো আমারও যুদ্ধ করব, তখন যদি আমাদের মধ্যে কেউ মারা যায় !"
-" আমরা বিশ্বজয় করব ।"
-" নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বজয়ী হবে ।"
অ্যারিস্টটল লক্ষ্য করেছিলেন আলেকজান্ডার আর হেফ্যাসটিয়নের বন্ধুত্ব, তার অমর বক্তব্য," এক আত্মা দুই দেহে বসবাস করছে ।" তাদের বন্ধনকে বলেছেন " ওমোরফোস ডেসমোস " গ্রিক ভাষায় যার অর্থ হয় " সুন্দর বন্ধন "।