Se 1 · Ep 4 · চতুর্থ পর্ব - উপলব্ধি

আলেকজান্ডারের যখন তেরো বছর বয়স তখন ফিলিপ তার জন্য উপযুক্ত গৃহশিক্ষকের সন্ধান করছিলেন । শিক্ষাদাতা হিসাবে আইসোক্র্যাটস আর স্পেউসিপ্পাসকে গ্রহণ করলেন । শেষে তিনি মহান দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে চয়ন করলেন এবং তাকে প্রদান করলেন মীজা শহরের টেম্পল অফ নিম্ফস শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে । পরিবর্তে তিনি অ্যারিস্টটলের বসবাসের শহর স্ট্যাগেইরাকে পূনর্নিমাণ করতে রাজি হলেন যা তিনি ধ্বংস করেছিলেন । তিনি সেই স্থানে পূণর্বসতি গড়ে তুললেন নাগরিকদের নিয়ে এনে এবং মুক্তি দিয়ে যাদের দাস বানানো হয়েছিল আর নির্বাসিতদের ক্ষমা করে । মীজা ছিল একটা শিক্ষাকেন্দ্র আলেকজান্ডার ও ম্যাসিডোনিয়ার অভিজাত সম্প্রদায়ের সন্তানদের জন্য, যেমন টলেমি, হেফ্যাসটিয়ন, ক্যাসান্ডার । এদের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী আলেকজান্ডারের বন্ধু ও তার ভবিষ্যত সেনানায়ক হয়েছিল, যারা ' কম্প্যানিয়নস্ ' নামে বিখ্যাত । অ্যারিস্টটল তার শিক্ষার্থীদের ঔষধ, দর্শন, নীতি, ধর্ম, যুক্তি ও শিল্পের শিক্ষা দিয়েছিলেন । তার শিক্ষকতায় আলেকজান্ডারের হোমারের রচনার প্রতি আগ্রহ জন্ম নিয়েছিল, বিশেষ করে ইলিয়াডের প্রতি । অ্যারিস্টটল তাকে একটা ভাষ্য যুক্ত প্রতিলিপি দিয়েছিলেন যা সে পরবর্তী কালে নিজের অভিযানের সময় কাছে রাখত । একদিন রাজমহলের বাগানের একটা সুন্দর, চারিদিকে মার্বেলের স্তম্ভে ঘেরা গম্বুজ যুক্ত চাতালের অভ্যন্তরে আলেকজান্ডার ও হেফ্যাসটিয়ন সময় কাটাচ্ছিল । আলেকজান্ডার একটা গদি যুক্ত চেয়ারে বসে ছিল, তার সামনে হেফ্যাসটিয়ন তার দিকে পিছন ঘুরে একটা জলাধারের প্রান্তে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে মাছ দেখছিল । সে পরেছিল একটা কমলা রঙের হাফহাতা সোনালি পাড় যুক্ত চিটোন, স্বল্প দৈর্ঘ্যের, হাঁটুর থেকে যথেষ্ট ওপর পর্যন্ত আবৃত । আলেকজান্ডারও একই প্রকার লালচে বাদামি রঙের একটা চিটোন পরেছিল । সে দেখল হেফ্যাসটিয়নের নগ্ন দুই পা খুব সুন্দর, তার উন্মুক্ত উরুদ্বয় খুব আকর্ষণীয় বোধ হল । আলেকজান্ডার লক্ষ্য করল ইদানীং নিজের প্রিয় বন্ধুর প্রতি এক ভিন্ন আকর্ষণ বোধ হচ্ছে । তার দৈহিক গঠন, ভাব ভঙ্গিমা, অভিব্যক্তি সবকিছু তার মধ্যে নতুন একপ্রকার সুখানুভূতি সৃষ্টি করছে । তার চোখ পড়ল সামনে টেবিলের ওপর রাখা পোড়ামাটির চিত্রিত ফুলদানির ওপর, যার গায়ে মেটে হলুদ ও কালো রঙে রঞ্জিত একটা চিত্র, যেখানে একজন ডানাযুক্ত দেবতা আর এক কিশোর অন্তরঙ্গ ভাবে দৃশ্যায়িত ছিল । পশ্চিমা বায়ুর দেবতা জেফাইরাস আত্মনিবেদন করেছেন স্পার্টান রাজকুমার হায়াসিন্থাসের সন্নিবদ্ধ উরুদ্বয়ের মাঝে । আলেকজান্ডারের মনে চিত্রটা অস্ফুট ভাবে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল । সে হেফ্যাসটিয়নকে কাছে ডেকে নিজের কোলে বসাল, তার হাত ধরল, চিটোনের হাতার নীচ থেকে দৃশ্যমান তার অর্ধনগ্ন হাত দুটো খুব সুন্দর । বসার জন্য তার চিটোন স্বভাবতই একটু উঠে গেছিল, আলেকজান্ডার সেটা আরও একটু উঠিয়ে তার উন্মুক্ত উরুতে স্পর্শ করল, আঙুল সঞ্চালন করল । হেফ্যাসটিয়নের তার স্পর্শ ভাল লাগছিল । আলেকজান্ডার তাকে দৃঢ় আলিঙ্গন করে, কয়েক মুহূর্ত তার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে একবার তার গালে চুম্বন করল । ছোটবেলা থেকে সবথেকে কাছের বন্ধু হওয়ায় তার প্রতি স্বভাবতই তার স্নেহ আছে । কিন্তু বর্তমানে কিশোর, আকর্ষণীয় সেই বন্ধুর প্রতি তার এক ভিন্ন গভীর স্নেহের উদ্রেক হচ্ছে । আলেকজান্ডার বলল," যদি তুমি আমার ক্যাটামাইট হতে !" ক্যাটামাইট হল একজন অপরিণত কিশোর যে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের অন্তরঙ্গ সঙ্গী, মূলত পেডেরাস্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে । পেডেরাস্টি হল প্রাচীন গ্রিস, রোমের একটা রীতি যেখানে একজন কিশোর পরিণত বয়স হওয়ার আগে পর্যন্ত একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের সাথে থাকত, মূলত বারো থেকে উনিশ বছর বয়স পর্যন্ত, বিশেষ করে মুখে দাঁড়ি হওয়ার আগে পর্যন্ত । আর সেই পুরুষ হত তার শিক্ষক, অভিভাবক ও পথ প্রদর্শক । অর্থাৎ সে পরিপূর্ণ পুরুষে পরিণত হওয়ার আগে পর্যন্ত একজন পরিণত পুরুষের সঙ্গ করত এবং ক্রমে নিজে পুরুষ রূপে পরিণত হত । এই সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই প্রেম ও যৌন সম্পর্কের রূপ ধারণ করত । গ্রিসে পুরুষের সমকামিতার, উভকামিতা স্বাভাবিক ভাবেই সম্মানিত ছিল । তবে গ্রিসের কিছু স্থান যেমন স্পার্টা নগরে পুরুষ সঙ্গীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন অনৈতিক মনে করা হত । আবার ক্যাটামাইট হল একজন সুন্দর, কমনীয়, কিছুটা নারী সুলভ, প্রাণবন্ত স্বভাবের কিশোর, যে একজন পুরুষের প্রেমিক এবং যৌন সম্পর্কে গ্রহণকারী সঙ্গী হতে পারে । এই প্রকৃতির কিশোরদের প্রাচীন গ্রিস, রোম, পারস্যের রাজপরিবার ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সদস্যরা দাস, প্রমোদ বালক অথবা নিজের সঙ্গী, প্রেমিক বা বিবাহিত সঙ্গী রূপে গ্রহণ করতেন । হেফ্যাসটিয়ন বলল," তুমি রাজকুমার বলে আমাকে ক্যাটামাইট বানাতে চাও ?" -" তুমি একজন উপযুক্ত ক্যাটামাইটের মত সুন্দর ।" -" তুমিও খুব সুন্দর আমারও তোমাকে ক্যাটামাইট রূপে ভাল লাগবে ।" -" তাই !" -" হ্যাঁ ।" আলেকজান্ডার জড়িয়ে ধরে থাকল প্রিয় বন্ধুকে । হালকা হওয়া বয়ে যাচ্ছিল চাতালের স্তম্ভ গুলোর মাঝের ব্যবধান দিয়ে, তাতে ভেসে আসছিল লাইয়রের সুরম্য সুর লহরী আর ওই ফুলদানির ওপর রাখা স্নিগ্ধ সাদা ও গোলাপি রঙের একগুচ্ছ গোলাপের মনোরম সুগন্ধ ।