Se 1 · Ep 3 · তৃতীয় পর্ব - ঈর্ষা
আলেকজান্ডার আর হেফ্যাসটিয়ন সবসময়ই খুব ভাল বন্ধুর মত দিন যাপন করে । আলেকজান্ডারের বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তার জন্য অ্যারিডিয়াস ঈর্ষাণ্বিত ছিল । তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব সম্পর্কে সে জানত, সে ভাবল হেফ্যাসটিয়নকে হেনস্থা করলে আলেকজান্ডার নিশ্চয়ই ব্যথিত হবে । সে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে তার ভবনে সৈনিক পাঠাল এই বলে যে সেদিন রাতে সে তাকে আমন্ত্রণ করেছিল তার সাথে ভোজসভায় যেতে কিন্তু সে জেষ্ঠ্য রাজকুমারের আগ্রহ উপেক্ষা করে নিজের বন্ধুর সাথে ভোজন করে । সৈনিক অ্যামিনটরের কাছে উপস্থিত হলে তিনি নিজের পুত্রকে তাদের হাতে তুলে দেন । তিনি জানেন তার পুত্র নির্দোষ, তার ধারণা পুত্রস্নেহ বশত তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে তার সম্মান নষ্ট হবে বরং নিজের পুত্রকে শাস্তি পেতে পাঠালে আদর্শ পিতা ও রাজপরিবারের অনুগত নাগরিক হিসাবে তার সম্মান বৃদ্ধি পাবে । হেফ্যাসটিয়নের বারংবার অনুরোধ তিনি শুনলেন না, সৈনিকরা তার হাত, পা শিকল দিয়ে বেঁধে, হাতে বাঁধা শিকলের প্রান্ত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে গেল, পা বাঁধা থাকায় সে বারবার পরে গেল । তাকে ফিলিপ ও অ্যারিডিয়াসের সামনে দাঁড় করানো হল, আলেকজান্ডার সেখানে ছুটে এল, ওলম্পিয়া একটু দূর থেকে দেখছিলেন । আলেকজান্ডার ফিলিপকে অনুরোধ করল যেহেতু হেফ্যাসটিয়ন তার বন্ধু তার এরূপ আচরণে সে দুঃখিত, তাকে দণ্ড সেই দিতে চায় । ফিলিপ অনুমতি দিলেন । হেফ্যাসটিয়ন পরেছিল একটা হাফহাতা, স্বল্প দৈর্ঘ্যের চিটোন; আলেকজান্ডার একটা বেতের দণ্ড দিয়ে তার নগ্ন হাতে পায়ে নিয়ন্ত্রিত ভাবে কয়েকবার প্রহার করল । হেফ্যাসটিয়ন আঘাত পেলেও তা তার কাছে সহনীয় ছিল, সে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল । আলেকজান্ডার থেমে যাওয়ার পর অ্যারিডিয়াস বলল," তুমি ওকে কত কম প্রহার করলে, ও কোনও আর্তনাদ বা অশ্রুপাত করল না !" আলেকজান্ডার বলল," আমি যেহেতু দণ্ড দিচ্ছি তার পরিমাণ আমি নির্ধারণ করব । অ্যারিডিয়াস ক্ষুব্ধ হল, ফিলিপ ওকে বললেন," ছেড়ে দাও অনেক হয়েছে ।" তার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না । সবাই চলে গেলে আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নকে নিজের ঘরে নিয়ে নিয়ে গেল, তাকে আসনে বসিয়ে সামনে হাঁটুর ভরে বসে তার হাতে পায়ে হাত বুলিয়ে দিল ।
-" তোমার কি খুব লেগেছে ? আমাকে ভুল বুঝো না । আমি এটা না করলে ওরা তোমার ওপর অনেক অত্যাচার করত ।"
-" আমি জানি, আমি তোমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলাম । আমি ঠিক আছি, চিন্তা করো না ।"
রাতে ওলম্পিয়া আলেকজান্ডারকে নিজের কক্ষে ডাকলেন ।
-" তুমি আজ যেটা করেছ সেটা রাজনৈতিক দৃষ্টিতে সঠিক । ভবিষ্যতে যখন তুমি শাসক হবে তখন অনেক লোকজন তোমার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র করবে, অনেকে তোমার অনুগত হওয়ার, শ্রদ্ধা করার অভিনয় গোপনে চক্রান্ত করবে । এমন সময় সেইসব মানুষ যারা মন থেকে তোমার বিশ্বাসযোগ্য, সবসময় তোমাকে সাহায্য করবে, বিপদে রক্ষা করবে তাদের খুব প্রয়োজন । এমন মানুষদের নিজের নিকট আত্মীয়ের ন্যায় দেখা উচিত, তাদের সমস্ত সুযোগ, সুবিধা, সম্মান দেওয়া উচিত যাতে তারা কখনও তোমার প্রতি বীতশ্রদ্ধ না হয় । তাদের ভালবাসা, সম্মান প্রদর্শন করা উচিত যাতে তারা তোমার স্বার্থের জন্য তোমার শত্রুর সাথে হাত না মেলায় ।"
-" তাছাড়া ওর অপরাধ ছিল না । অ্যারিডিয়াস মিথ্যা কথা বলেছে ।"
-" আমি জানি । কিন্তু তুমি আজ যেটা করেছ সেটা বন্ধুর প্রতি স্নেহের জন্য করেছ । একজন শাসকের আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় । তুমি রাজনৈতিক লাভের ভিত্তিতে কারও প্রতি স্নেহশীল হবে আর প্রয়োজনে তাকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা বোধ করবে না । তোমার থেকে সুবিধা প্রাপ্ত যেকোন ব্যক্তি যেকোন সময় তোমার বিরুদ্ধে যেতে পারে ।"
-" কিন্তু হেফ্যাসটিয়ন এরকম না ।"
-" আমি জানি । তোমার হেফ্যাসটিয়নের সাথে বন্ধুত্ব তোমাদের মধ্যেকার আবেগের ওপর তৈরি, সেটা খুব ভাল । কিন্তু তোমার চরিত্রে কঠোরতা প্রয়োজন । ওর সাথেও কঠোর আচরণের প্রবণতা থাকতে হবে তোমার মধ্যে । তবে ওর সাথে বন্ধুত্ব যেন নিখাদ চিরস্থায়ী হয় ।"
-" ঠিক আছে ।"
-" আমি দেখতে চাই ।"
আলেকজান্ডার চলে যাওয়ার পর ওলম্পিয়া ভাবলেন নিজের পরিকল্পনার কথা । অ্যারিডিয়াসের একজন একান্ত সেবক এক দাসপুত্রকে তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন তাকে এই পরামর্শ দিতে যে যদি সে হেফ্যাসটিয়নের ওপর অত্যাচার করে তাহলে আলেকজান্ডার দুঃখিত হবে, কারণ তিনি জানেন অ্যারিডিয়াস আলেকজান্ডারের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত, সে তাকে দমন করার ইচ্ছা রাখে । আর সেই সেবককে এ কথা গোপন রাখতে আদেশ দেন । তার উদ্দেশ্য ছিল আলেকজান্ডার এই পরিস্থিতিতে কি করে আর সে কতটা কঠোর মনোভাবের হতে সেটা দেখা, তাই এই ষড়যন্ত্র করা ।
পরেরদিন হেফ্যাসটিয়ন মহলে আলেকজান্ডারের সঙ্গে ছিল । আলেকজান্ডার তাকে তলোয়ার যুদ্ধে আহ্বান জানাল আর একটা শর্ত রাখল, যে হেরে যাবে তাকে যে জিতে যাবে সে ইচ্ছামত শাস্তি দেবে । হেফ্যাসটিয়নও একজন যুদ্ধে শিক্ষার্থী, তার মধ্যেও সুস্পষ্ট যোদ্ধা সুলভ মনোভাব আছে, সে শর্ত স্বীকার করল । মহলের প্রাঙ্গনে দুজনের দ্বন্দ্ব শুরু হল । দুজনেই বয়সানুযায়ী যথেষ্ট দক্ষ, ক্ষিপ্র গতিতে দুটো তলোয়ারের ধাক্কা লাগতে থাকল, রোদে ঝলমল করে উঠল দুই জয়াকঙ্খী অসি । হেফ্যাসটিয়ন এক সময় আলেকজান্ডারের তলোয়ারের ওপর নিজের তলোয়ার দিয়ে সর্ব শক্তিতে ধাক্কা দিল; আলেকজান্ডার ছিটকে পড়ল, সে আবার উঠে আক্রমণ করল । একটু পরে সেও তাকে একই ভাবে মাটিতে ফেলে দিল । হেফ্যাসটিয়নের হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেল, সে তলোয়ার তুলে নিয়ে উঠে আবার আক্রমণ করল কিন্তু আলেকজান্ডার ক্ষিপ্রতার সাথে পারল না, তার তলোয়ারের আঘাতে তার হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে পড়ে গেল । আলেকজান্ডার তৎক্ষণাৎ তার তলোয়ারের শীর্ষ হেফ্যাসটিয়নের গলার সামনে ধরল, সে আবার ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল । আলেকজান্ডার ভূপতিত হেফ্যাসটিয়নের সামনে তলোয়ার ধরে দাঁড়াল, তাকে হাত ধরে তুলে টানতে টানতে নিয়ে গেল । হেফ্যাসটিয়ন জানে শর্ত অনুসারে এখন তাকে শাস্তি পেতে হবে । আলেকজান্ডার তাকে খোলা জায়গায় একটা স্তম্ভের সামনে দাঁড় করাল । সে তাকে স্তম্ভের দিকে মুখ করে তার গায়ের ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে, তার দু হাত স্তম্ভের দুপাশ দিয়ে নিয়ে অপর দিকে একটা হুকের সাথে ঝুলতে থাকা একটা শিকল দিয়ে বেঁধে দিল । হেফ্যাসটিয়ন ভেবেছিল এটা শুধুই খেলা কিন্তু তার মনে হল আলেকজান্ডার বেশি কঠোর ব্যবহার করছে । এরপর আলেকজান্ডার একটা বেতের দণ্ড নিয়ে এল, সে হেফ্যাসটিয়নের চিটোন পিছন দিক থেকে তুলে কোমরে গুঁজে দিল । সে খুব অবাক আর শঙ্কিত হল, আলেকজান্ডার তার অনাবৃত নিতম্বের ওপর বেত্রাঘাত শুরু করল । সে অনুভব করল আলেকজান্ডারের প্রহার গতকালের থেকে তীব্র, কয়েকবার আঘাতের পর সে কেঁদে ফেলল, আরও কয়েকবার প্রহার করার পর আলেকজান্ডার থেমে গেল । সে ওকে ওখানে ওই অবস্থায় রেখে চলে গেল । হেফ্যাসটিয়ন বন্ধুর এরকম আচরণে খুব দুঃখিত হল, তার মুখ অশ্রুসিক্ত ছিল, আঘাতের যন্ত্রণা তখনও ছিল । কিছুক্ষণ পর সে ভাবল আলেকজান্ডার স্বেচ্ছায় তার সাথে এরকম ব্যবহার করবে না, নিশ্চয় আগের দিন সে তার দণ্ড লাঘব করার চেষ্টা করেছিল বলে তার পরিবার তার ওপর অসন্তুষ্ট কারণ রাজপরিবারে অপরাধীদের খুব কঠোর দণ্ড দেওয়া হয়, সে নিশ্চয়ই পরিবারের চাপেই এরকম করছে । সে অপেক্ষা করতে থাকল আলেকজান্ডারের ফিরে আসার ।
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে আলেকজান্ডার ফিরে এল । হেফ্যাসটিয়ন একই ভাবে সেখানে দাঁড়িয়েছিল । দীর্ঘক্ষণ হাত বাঁধা থাকায় এবং তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হওয়ায় তার হাত পা ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল, দুপুর থেকে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ছিল । আলেকজান্ডার তার গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেল, দ্রুত তাকে খুলে দিয়ে সেখান থেকে নিয়ে গেল, যাওয়ার সময় তার পোশাক ঠিক করে দিল । নিজের ঘরে নিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে তার যন্ত্রণা দূর করার চেষ্টা করল । তাকে সযত্নে খাবার খাওয়ালো । হেফ্যাসটিয়ন বুঝতে পারল সে নিজের আচরণের জন্য দুঃখিত । আলেকজান্ডার জিজ্ঞাসা করল," তোমার খুব কষ্ট হয়েছে ?"
-" না একজন যোদ্ধার এগুলো সহ্য করা উচিত । তুমি দুঃখিত হয়ো না ।"
-" আমাকে ক্ষমা করে দাও ।"
-" কোনও ব্যাপার না ।"
আলেকজান্ডার ভাবল মায়ের প্ররোচণায় সে নিজের প্রিয় বন্ধুর সাথে দুর্ব্যবহার করল, এটা অত্যন্ত অনুচিত, এরকম আর কখনও করা ঠিক হবে না, তার সাথে সর্বদা সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখবে । হেফ্যাসটিয়ন একজন উদার মানসিকতার মানুষ এজন্য আলেকজান্ডার তাকে খুব ভালবাসত ।
ওলম্পিয়া ভাবলেন আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নের সাথে কঠোর আচরণ করতে পেরেছে অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে । তিনি চান আলেকজান্ডার একজন ক্রূর, নিষ্ঠুর শাসক হয়ে উঠুক যাতে সে তার সব শত্রুদের কঠোর ভাবে দমন করতে পারে আর নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা বজায় রাখতে পারে, কেউ যেন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস না করে ।
অ্যামিনটরের দূর সম্পর্কের এক বয়স্কা আত্মীয়া তার নিকটে থাকেন । তিনি তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন," নিজের ছেলেকে কেন বাঁচালে না ?"
-" আমি রাজআজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করতে পারতাম না ।"
-" তুমি অনুরোধ করতে পারতে তাকে মুক্ত করার, চেষ্টা তো করতে ! তুমি তো জান সে নির্দোষ ছিল !"
-" সেটা রাজপরিবারকে অসম্মান করা হত । তাছাড়া লোকে ভাবত আমি পুত্রস্নেহে দূর্বল ! সন্তানকে দণ্ড থেকে বাঁচানো, তার জন্য রাজআজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করা এটা দূর্বলমতি পুরুষের লক্ষণ, এটা আমার সম্মান বজায় রাখার জন্য ঠিক না ।"
-" তোমাদের মত উচ্চ বংশীয়দের সন্তান কি শুধু তোমাদের মিথ্যা পৌরুষের জন্য ? নিজের নির্দোষ বাচ্চা ছেলেকে দণ্ড পাওয়ালে নিজের বৃথা গর্বের জন্য !"
-" তাতে কী এমন হয়েছে ? কয়েকটা বেতের আঘাত পেয়েছে, সেটা তো বাচ্চাদের প্রাপ্যই !"
-" মূর্খ অহংকারী পুরুষ, হেফ্যাসটিয়নের মত সুপুত্রের
পিতা হয়েও তাকে অবহেলা করলে রাজপরিবারের পদলেহন করার জন্য ! দেখো রাজপরিবার তাকে তার যোগ্য সম্মান দেবে আর তুমি তোমার হীন মানসিকতার ফল পাবে ।"
-" আমি রাজপরিবারের সাথে সুসম্পর্ক রাখি বলেই আজ সে রাজকুমার আলেকজান্ডারের বন্ধু, আমার জন্যই সে রাজকুমারের সাথে শিক্ষা লাভ করছে ।"
-" এসব তুমি তোমার সস্তা অহংকারের জন্য করছ, ছেলের প্রতি স্নেহ বশত নয় । কিন্তু রাজকুমার তাকে স্নেহ করে । দেখো একদিন সে আলেকজান্ডারের পাশে অবস্থান করবে, তোমার থেকেও অনেক বড় হবে । তোমার মত ব্যক্তি শুধুই পদলেহন করার যোগ্য ।"