Se 1 · Ep 2 · দ্বিতীয় পর্ব - রাজদণ্ড
সন্ধ্যার পর ফিলিপের আদেশে আলেকজান্ডার তার কক্ষের দিকে যাচ্ছিল । তার পরনে ছিল উজ্জ্বল লালচে বাদামি রঙের সোনালী পাড় যুক্ত চিটোন, হাফহাতা, স্বল্প দৈর্ঘ্যের অর্ধেক উরু পর্যন্ত আবৃত, গলায় সোনার হার ও পান্না খচিত সোনার পেনডেন্ট, স্বর্ণালঙ্কৃত বেল্ট ও জুতো । ফিলিপ তার কক্ষের সামনের অলিন্দে পায়চারি করছিলেন, শুভ্র চিটোন পরিহিত স্বর্ণালঙ্কার ভূষিত, মাথায় স্বর্ণ ও হীরক নির্মিত জলপাই পাতার ন্যায় ডিজাইন করা মুকুট, হাতে ছিল একটা সরু, লম্বা, নমনীয় বেত্র দণ্ড । আলেকজান্ডার তার কাছে এসে সম্ভাষণ করল আর তার অভিসন্ধি বুঝতে পারল । পুত্র হিসাবে আলেকজান্ডারের প্রতি তার স্নেহ নেহাত কম, তার প্রকৃত পুত্রস্নেহ তার জেষ্ঠ্য পুত্র অ্যারিডিয়াসের প্রতি, আলেকজান্ডারের গুণ ও দক্ষতার জন্য ফিলিপ তার প্রতি স্নেহ রাখলেও তা সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত ভালবাসা নয় । ফিলিপ আলেকজান্ডারকে চান তার ও তার জেষ্ঠ্য পুত্রের একজন অনুগত সেবক হিসাবে, একজন সুদক্ষ যোদ্ধা তথা সামরিক নায়ক যে রাজা ও পরবর্তী রাজার আজ্ঞাবাহী পার্ষদ হয়ে থাকবে । আলেকজান্ডার যদিও রাজপরিবারের সংস্কার অনুযায়ী পিতা তথা মহারাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল । ফিলিপ হাতে থাকা বেত দিয়ে তার নগ্ন উরুদ্বয়ের পশ্চাৎ অংশে দুবার করে সজোরে প্রহার করলেন । ইতিমধ্যে উপস্থিত হলেন মহারাণী ওলম্পিয়া, অসাধারণ রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, অসামান্যা সুন্দরী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও উচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন, অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী নারী । তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুক্ত দীপ্ত চোখ, সূক্ষ্ম ভ্রু, সুগঠিত নাক, চুনীর ন্যায় লাল রমণীয় ঠোঁট, রহস্যময় স্মিত হাস্য যুক্ত, স্বর্ণাভ বাদামি বর্ণের সুবিন্যাস্ত কেশরাশি, হীরা ও চুনী খচিত স্বর্ণ মুকুট শোভিত, বিচিত্র পুষ্পে সজ্জিত । সুন্দর বাদামি-বেগুনি রঙের রাজকীয় পিপলোস পরিহিতা, চুনী, হীরা, মুক্ত খচিত স্বর্ণ হার, কর্ণভূষন, দ্বীমুখ সিংহ যুক্ত স্বর্ণ কঙ্কণ, বাহুতে সর্পাকৃতি বাহুবন্ধ, রত্নাঙ্গুরিয়, কোমরে কিঞ্চিত ওপরে স্থিত কোমরবন্ধ ।
" বৃথা আস্ফালন করা ত্যাগ কর ফিলিপ ", বলে উঠলেন মহারানী ওলম্পিয়া, " আমার ছেলেকে অযথা পীড়িত করছ ।"
" তোমার ছেলে আজ দ্বন্দ্বে জিততে পারেনি ", ফিলিপ বললেন ।
-" ওকে ছল করে হারানো হয়েছে ।"
-" একজন দক্ষ যোদ্ধা সাধারণ ছলনাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা রাখে ।"
-" অবশ্যই । ও জিতে যেত যদি সেনাপ্রধান দ্বন্দ্ব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা না করতেন ।"
-" তোমার এত গর্ব কোনও সুফল আনবে না ।"
-" জিউসের পুত্র অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ ফল লাভ করবে । তুমি শুধু দেখতে থাক ।"
জিউস ভক্তিনী ওলম্পিয়া আলেকজান্ডারের জন্মের মুহূর্ত থেকেই তাকে গ্রিসের দেবতাদের অধিপতি জিউসের পুত্র বলে মানতেন এবং আলেকজান্ডারকে এই শিক্ষায় দিয়েছেন সে জিউসের পুত্র ফিলিপের নয় । তিনি আলেকজান্ডারকে বিশ্বজয়ী সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতেন, সেই স্বপ্ন তিনি শৈশব থেকে তাকে দেখিয়েছেন, তদানুরূত শিক্ষার সর্বত চেষ্টা করেছেন ।
" তুমি অযথা ওকে উৎপীড়ণ করা বন্ধ করো ।"
-" আমি আমার ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিচ্ছি ।"
-" তুমি শুধু ওর ওপর অত্যাচার করার চেষ্টা করছ ।"
-" তুমি ওকে মাথায় তুলছ ।"
ওলম্পিয়া হেসে বললেন," নিজের হিংসা প্রকাশ করার জন্য অজুহাত খুঁজছ । তোমার ওকে নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই, ও দেবশ্রেষ্ঠ জিউসের পুত্র, তুমি চাইলেও ওকে দমন করতে পারবে না ।" ফিলিপ জানেন ওলম্পিয়ার কথা ঠিক, আলেকজান্ডার যথেষ্ট দক্ষ ও বুদ্ধিমান, সে ভবিষ্যতে অবশ্যই একজন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা তথা শাসক হতে পারবে, কিন্তু ফিলিপ তার প্রিয় পুত্র অ্যারিডিয়াসের জন্য ম্যাসিডোনিয়ার রাজ সিংহাসন সংরক্ষিত রেখেছেন তাই আলেকজান্ডারকে তিনি দমন করে রাখতে চান, তার সামর্থ্যের ব্যবহার করতে চান অ্যারিডিয়াসের স্বার্থে, তাই সর্বদা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চান ।
-" ও আমার সন্তান, ওর জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নেব ।"
-" না ও তোমার সন্তান নয়, নিজের ক্ষমতার বৃথা আস্ফালন করো না, তোমার সেই যোগ্যতা নেই ।"
যুদ্ধে আঘাতের ফলে ফিলিপের এক চোখ নষ্ট হয়েছিল অনেক আগে, তিনি এক চোখে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন ওলম্পিয়ার দিকে । ওলম্পিয়া কোনও দিন আলেকজান্ডারের ওপর ফিলিপের পিতৃত্ব স্বীকার করেননি, গর্ভাবস্থা থাকাকালীন তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন এক তীব্র বিদ্যুতের ঝলক তার পেটে প্রবেশ করেছিল আর এক তীব্র আলো চারিদিক ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ধারণা এটা বজ্রের দেবতা জিউসের শক্তি, তার সন্তান জিউসের বর পুত্র । ফিলিপও স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনি এক সিংহমুখ আকৃতি যুক্ত ঢাল দিয়ে রক্ষা করছেন তার স্ত্রীর গর্ভ । যদিও ফিলিপ ও ওলম্পিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল তবুও তাদের বিবাহ অনেকটাই ম্যাসিডোনিয়া ও ইপিরাসের রাজনৈতিক চুক্তির ফল ছিল । ফিলিপের অস্থির চিত্ত ও ওলম্পিয়ার উচ্চাকাঙ্খা ও ঈর্ষা যার ফলে ক্রমাগত বিবাদের জন্য তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বিধ্বস্ত হয় । এমনও ধারণা করা হয় মিশরের শেষ ফ্যারাও দ্বিতীয় নেকটানেবো মিশরকে শক্তিশালী পারস্য সাম্রাজ্যের অধিনত হওয়ার আশঙ্কায় ম্যাসিডোনিয়ার রাজসভায় পালিয়ে আসেন, সেখানে তিনি রানী ওলম্পিয়ার প্রেমে পড়েন, তাদের সেই সম্পর্কের ফলেই আলেকজান্ডারের জন্ম ।
-" তুমি আবার আমাকে অপমান করছ !"
ওলম্পিয়া বক্র হাস্য করে বললেন," তোমার মত মন্দ বুদ্ধির পুরুষের দেবপুত্রের পিতৃত্বের গৌরব সম্ভব নয় ।"
ফিলিপ ক্রুদ্ধ হলেন । তিনি একজন সফল শাসক তথা সামরিক নায়ক । তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ জয় করেছেন তার সামরিক দক্ষতার জন্য এবং ম্যাসিডোনিয়াকে গ্রিসের এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিশালী প্রদেশ রূপে গড়ে তুলেছেন । তার সুদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য ম্যাসিডোনিয়া প্রভূত উন্নতি ও বিশ্ব রাজনীতিতে উচ্চ স্থান লাভ করেছে । তবুও তিনি বুদ্ধিমত্তায় কখনও রানী ওলম্পিয়াকে অতিক্রম করতে পারেননি, ম্যাসিডোনিয়ার রাজনীতিতে তার বিস্তীর্ণ প্রভাব রয়েছে, নিজের তীক্ষ্ণ কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি অনেক সময়ই ফিলিপের সব রানীদের মধ্যে প্রধান রানী থেকেছেন ।
-" দেবতার গৌরবের জন্য কি পৃথিবীর পিতার অবমাননা করতে হবে ?"
-" তার জন্য তুমিই দায়ী, বাবার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করলে তোমার অসম্মান হত না । তুমি শুধুই একটা ধূর্ত, অস্থির, কামুক পুরুষ ।"
ফিলিপ ক্রুদ্ধ হয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া না করে চুপ করে থাকলেন । ওলম্পিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে গেলেন । তার যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ ফিলিপ আলেকজান্ডারের দিকে ধাবিত হলেন । তিনি তার চিটোন পিছন থেকে তুলে কোমরের বেল্টে গুঁজে দিলেন, তারপর তার উন্মুক্ত নিতম্বে তীব্র বেত্রাঘাত করলেন । প্রাচীন গ্রিস, রোমে দাস ও অপরাধীদের নগ্ন করে প্রহার করার রীতি ছিল, অনেক সময় বালকদের ওপরও তা প্রয়োগ করা হত । একে বলে স্প্যাংকিং বা ক্যানিং যা হল কারও আবৃত বা অনাবৃত নিতম্বের ওপর বেত্রাঘাত করা । বিংশ শতাব্দীর মধ্য পর্যন্ত অনেক ইউরোপীয় স্কুলে এর প্রচলন ছিল । আলেকজান্ডার নিস্তব্ধ ও স্থির হয়ে প্রহার গ্রহণ করলেও কয়েকটা আঘাতের পর তার চোখ দিয়ে অশ্রুপাত হতে থাকল । ফিলিপ থেমে গেলেন । আলেকজান্ডারের জিউস পুত্র হওয়া ফিলিপের কাছে অবশ্যই গর্বের কিন্তু তার খেদ এটাই যে আলেকজান্ডার ওলম্পিয়ার সন্তান । ওলম্পিয়ার সাথে তার মতানৈক্য, তার উচ্চাকাঙ্খা, তার ইচ্ছামত পুত্রকে পরিচালনা করা, এসবের জন্য ফিলিপের আশঙ্কা ছিল আলেকজান্ডার বড় হলে ওলম্পিয়া ষড়যন্ত্র করে তাকে সিংহাসনচ্যুত করে, অ্যারিডিয়াসের অধিকার খর্ব করে নিজের ছেলেকে সিংহাসনে বসাবে; তাছাড়া আলেকজান্ডার তার মায়ের অনুগত, ভবিষ্যতে তার ওপর বিশ্বাস করা কঠিন । দেবপুত্রের সম্মান তার প্রিয় পুত্র অ্যারিডিয়াস পেলে তিনি সম্পূর্ণ স্বস্তি পেতেন । কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে শেষ প্রহার করে বেতটা ছুঁড়ে ফেলে চলে গেলেন । আলেকজান্ডারের চোখ থেকে অশ্রু ঝড়ে পড়ল । দূরে থাকা কিছু রক্ষী ও সেবক তাকে সেই অবস্থায় দেখতে পেল। তখনই হেফ্যাসটিয়ন সেই স্থানে উপস্থিত হল, সে আলেকজান্ডারের অসংলগ্ন বস্ত্র ও আঘাতের চিহ্ন দেখে কী ঘটেছে বুঝতে পারল, এরকম কিছুর আশঙ্কা সে করেছিল, তাই সে এদিকে আসছিল । কাছে গিয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়ে তার পোশাক ঠিক করে দিতে গেলে সে হাত ধরে বলল," থাক ছেড়ে দাও ।" হেফ্যাসটিয়ন বুঝল ওর অভিমান হয়েছে, সে তাকে তার কক্ষে নিয়ে গেল । হেফ্যাসটিয়ন দুঃখিত হল এই ভেবে আজকের দিনটা সে আলেকজান্ডারের সাথে সে খুব ভাল সময় কাটিয়েছিল, তারপর আবার ওর সাথে এরকম । আজ দ্বিতীয়বার হেফ্যাসটিয়নের স্পর্শে আলেকজান্ডার স্বস্তি বোধ করল । তখন হেফ্যাসটিয়ন ওর পোশাক ঠিক করে দিল । তাকে সেই সময়ে মহলে দেখে সে খুশি ও অবাক দুটোই হয়েছিল, জিজ্ঞাসা করায় জানতে পারল, তার পরিবার আজ মহলে নৈশভোজে নিমন্ত্রিত । হেফ্যাসটিয়নের পিতা অ্যামিনটর রাজপরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন । ওরা দুজন রাতে আলেকজান্ডারের কক্ষে এক সাথে ভোজন করল । মহলের অতিথিদের সাথে তাদের ভোজন করায় কোনও রুচি নেই, না আলেকজান্ডার রাজপরিবারের যথেষ্ট সম্মানিত সদস্য, না হেফ্যাসটিয়নের কোনও গুরুত্বপূর্ণ অতিথি, তার পিতা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও সেই শুধুই একজন কিশোর আর এসব শুধুই রাজনৈতিক উপচারিকতা ছিল ।
রাজমহলের সুসজ্জিত ভোজসভায় বিবিধ খাদ্যের পদে সজ্জিত টেবিলের চারিদিকে বসে আছেন রাজপরিবারের সদস্য ও আমন্ত্রিত ব্যক্তিরা । অ্যামিনটর এক সময় ফিলিপের কাছে রাজকুমার আলেকজান্ডারের প্রশংসা করলেন । ফিলিপ আপ্লুত হয়ে বললেন," আলেকজান্ডারকে পুত্র রূপে পেয়ে আমি গর্বিত, সে দেবরাজ জিউসের পুত্র, পৃথিবীতে তার পিতৃত্ব লাভ করা অনেক বড় সৌভাগ্য আমার, সে ভবিষ্যতে অবশ্যই আরগীড রাজবংশের এবং সমগ্র গ্রিসের অন্যতম মহান ব্যক্তি হবে ।" ফিলিপের কথা শুনে ওলম্পিয়া মনে মনে তাকে ভর্ৎসনা করলেন, ফিলিনা হতাশ হলেন কারণ তার পুত্র দেবপুত্রের মর্যাদা পায়নি, অ্যারিডিয়াস বাবার ওপর অসন্তুষ্ট হল, ফিলিপ সবসময় ওর পক্ষ নিয়ে আলেকজান্ডারকে ছোট করলেও অতিথিদের সামনে তার গুণকীর্তন করছেন । ওলম্পিয়া ভাবলেন," এই নীচ, মিথ্যাবাদী পুরুষ এখন বাইরের লোকের সামনে ছেলের প্রশংসা করছে নিজের মান রাখার জন্য, যে বাবার দায়িত্ব পালন করতে জানে না, অপদার্থ !" ফিলিপের এই স্বভাব তিনি ভাল করেই জানেন ।