Se 1 · Ep 1 · প্রথম পর্ব - উদ্যানের করবী ও জুঁই ফুল
খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৩ অব্দ, গ্রিসের ম্যাসিডোনিয়া প্রদেশের রাজধানী পেল্লা শহর, রাজমহলের ক্রীড়াঙ্গনে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আয়োজন; রাজসিংহাসনে বসে আছেন ম্যাসিডোনিয়ার অধীশ্বর দ্বিতীয় ফিলিপ; একটি সিংহাসনে বসেছিলেন ফিলিপের চতুর্থ স্ত্রী ইপিরাসের রাজকন্যা, ম্যাসিডোনিয়ার মহারানী অলিম্পিয়াস / ওলম্পিয়া; এক স্থানে জেষ্ঠ্য পুত্র, মহারানী ফিলিনার পুত্র অ্যারিডিয়াস, যিনি ভবিষ্যতে তার শাসনকালে তৃতীয় ফিলিপ বলে পরিচিত হবেন; দর্শকাসনে আছেন আরও কিছু সভাসদ আর সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য । দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ফিলিপ ও ওলম্পিয়ার পুত্র তৃতীয় আলেকজান্ডার, যাকে ভবিষ্যতে পৃথিবী বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং সিকন্দর বলে যানবে; প্রতিপক্ষ হিসাবে আছে তার সমবয়সী তিনজন কিশোর যারা ফিলিপের সেনানায়কদের সন্তান । কুস্তি লড়াই শুরু হল আলেকজান্ডার প্রথম প্রতিপক্ষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভূপতিত করে পরাজিত করল, বাকি দুই কিশোরও একই ভাবে পরাজিত হল । মহারানী ওলম্পিয়া পুত্রের জয়ে সন্তুষ্ট হলেন, ফিলিপ নির্লিপ্ত ভাবেই দেখলেন, অ্যারিডিয়াস ঈর্ষা বশত ক্ষুব্ধ হল । আলেকজান্ডার ময়দান ছেড়ে বেরোবে এমন সময় দ্বিতীয় ছেলেটা তাকে পিছন থেকে আক্রমণ করল, সে তাকে পিছন থেকে চেপে ধরল, আলেকজান্ডার তাকে ছাড়িয়ে আবারও মাটিতে ফেলে দিল । এবার তৃতীয়জন তাকে একই ভাবে আক্রমণ করল, আলেকজান্ডার কিছু করবে তার আগেই সে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল । আলেকজান্ডার মুখ থুবড়ে পড়ল, ছেলেটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আলেকজান্ডার ঘুরে তাকে মারার চেষ্টা করল কিন্তু সে তার দু হাত মাটিতে চেপে ধরেছিল । আলেকজান্ডার চেষ্টা করল ছাড়িয়ে ওঠার, তখনই একজন সেনাপ্রধান যুদ্ধের শিঙা বাজিয়ে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করল । ফিলিপ ফিলিপ কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন, ওলম্পিয়া একটু উদাস হয়ে থাকলেন, অ্যারিডিয়াস খুশি হয়ে চলে গেল ।
যুদ্ধাভ্যাস শেষ করার পর ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ আলেকজান্ডার ময়দান থেকে বেরিয়ে এল, তখন তার কাছে এসে উপস্থিত হল তার সমবয়সী, তার সবথেকে কাছের বন্ধু হেফ্যাসটিয়ন । হেফ্যাসটিয়ন অ্যামিনটোরস ছিল ম্যাসিডোনিয়ার এক অভিজাত পরিবারের ছেলে । তার পিতা অ্যামিনটর একজন রাজপরিবারের দ্বারা সম্মানিত উচ্চ শ্রেণীর ব্যাক্তি । তার রাজপরিবারের সাথে সুসম্পর্ক আছে, সেই সূত্রে হেফ্যাসটিয়নের সাথে আলেকজান্ডারের বন্ধুত্ব ।তাদের উভয়েরই বর্তমানে তেরো বছর বয়স । তারা একসাথে বড় হয়েছে, পড়াশোনা ও যুদ্ধ শিখেছে, খেলাধূলা করেছে । হেফ্যাসটিয়ন প্রায়ই রাজমহলে আসা যাওয়া করে থাকে । তারা একে অপরের প্রাণের বন্ধু । আজ যুদ্ধাভ্যাসের সময় সেও সেখানে উপস্থিত ছিল, সে জানত আলেকজান্ডারকে ছল করে হারানোর জন্য সে দুঃখিত, সেও তার জন্য দুঃখিত, সে তাকে খুশি করার চেষ্টা করল । হেফ্যাসটিয়নের হাতে ছিল একটা উজ্জ্বল সোনালি রঙের বস্ত্র, এটা হল হিম্যাটিয়ন, এটা একটা লম্বা আয়তাকর কাপড় যেটা কাঁধে ঝুলিয়ে রেখে পরা হয় । আলেকজান্ডার সে সময় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ছিল, তার পরনে ছিল শুধু একজোড়া চামড়ার জুতো । প্রাচীন গ্রিসে পুরুষদের নগ্নতা সম্মানিত ছিল । যুদ্ধাভ্যাস বা খেলার ময়দানে পুরুষের সম্পূর্ণ অনাবৃত সুঠাম দেহ তার শৌর্যের প্রকাশ হিসাবে দেখা হত এবং কিছু অনুষ্ঠানে, সভায় বা মধুশালায় পুরুষরা বস্ত্রহীন হয়ে উপস্থিত থাকত, যা তাদের রাজকীয়তা বা আভিজাত্যের মধ্যে পড়ে । হেফ্যাসটিয়ন হিম্যাটিয়নটা আলেকজান্ডারের বাঁকাঁধ থেকে পিঠের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে ডানকাঁধে একটা পান্না খচিত সোনার ব্রোচ দিয়ে তার ওপরের দু প্রান্ত আটকে দিল । আলেকজান্ডারের নগ্ন দেহের ওপর কাঁধ থেকে পিঠের ওপর আলগা ভাবে ঝুলে থাকা সুবর্ণ হিম্যাটিয়ন অত্যন্ত সুন্দর লাগছিল । হেফ্যাসটিয়ন আলেকজান্ডারকে হাত ধরে রাজমহলের বাগানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, আলেকজান্ডার বলল,' দাঁড়াও আমি কক্ষে গিয়ে চিটোনটা পরে আসি ।' হেফ্যাসটিয়ন বলল,' থাক না, তোমাকে এভাবে খুব সুন্দর লাগছে ।' আলেকজান্ডার আর কিছু বলল না । যদিও এটা একজন গ্রিক বালকের জন্য লজ্জাজনক না তবুও অনাবৃত দেহ যুদ্ধাভ্যাস বা ক্রীড়াঙ্গনে যেমন বীরত্বময় ও সম্মানিত হয় তেমনই রাজমহলের সুসজ্জিত বাগানে রাজকুমারের রাজকীয় পোশাক ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেরানোয় শোভনীয়, যখন কিনা তার অভিজাত বন্ধু সুন্দর পোশাক পরে আছে । তবুও হেফ্যাসটিয়নের নিজের বন্ধুর সাথে এরকম মজা করতে ভাল লাগে, আলেকজান্ডারও বন্ধুকে খুশি করার জন্য আপত্তি করে না । হেফ্যাসটিয়ন পরেছিল একটা হাফহাতা চিটোন যা তার তার হাঁটুর থেকে কিছুটা ওপরে অর্ধেক উরু পর্যন্ত ঢেকে ছিল । চিটোন প্রাচীন গ্রিসের একটি পোশাক যা হাতাযুক্ত বা হাতাছাড়া হয়, পুরুষ স্ত্রী উভয়েই পরে, পুরুষদের ক্ষেত্রে মূলত কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত বা কম দৈর্ঘ্যের হত । হেফ্যাসটিয়ন লক্ষ্য করল যুদ্ধের অভ্যাস করার সময় বার মাটিতে পড়ার জন্য আলেকজান্ডারের সারা গায়ে অনেক ধুলো লেগে গেছে । সে তার হাত বাগানের সরোবরের দিকে টেনে নিয়ে গেল ।
হেফ্যাসটিয়ন -" স্নান করে নাও তোমার ভাল লাগবে ।"
-" না থাক, আমার ইচ্ছা করছে না ।"
হেফ্যাসটিয়ন ক্লান্ত, ধূলাধূসরিত আলেকজান্ডারকে জোর করে জলে নামাল । সে তার কাঁধের হিম্যাটিয়নটা খুলে সরোবরের ধরারের একটা বেদীতে রেখেদিল । আলেকজান্ডার জুতো খুলল, হেফ্যাসটিয়ন তাকে ধরে জলে নামিয়ে সরোবরের ধরারের সিড়ির নীচের ধাপে বসিয়ে দিল । আলেকজান্ডার সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় জলে অর্ধনিমগ্ন হয়ে উবু হয়ে বসে থাকল । হেফ্যাসটিয়ন ঘড়ায় করে জল ঢেলে তার গায়ের সব ধুলো স্নেহের সাথে পরিষ্কার করে দিল । দ্বন্দ্ব যুদ্ধে প্রহারের আঘাতে আলেকজান্ডারের গায়ে ব্যাথা ছিল, হেফ্যাসটিয়নের সস্নেহ স্পর্শে সে আরাম বোধ করল । হেফ্যাসটিয়ন জানত সেই সময় তার বন্ধুর অবস্থা, তাই ইচ্ছা করেই তার ব্যাথা আর ক্লান্তি দূর করার জন্য তাকে যত্ন করে স্নান করিয়ে দিল । স্নানের পর সে তাকে সরোবরের ধরারের বেদিতে বসাল, হিম্যাটিয়নটা তাকে আবার পরিয়ে দিল, ডানকাঁধে পান্না জড়িত স্বর্ণ নির্মিত ব্রোচ দিয়ে । স্নানের পর শুদ্ধ দেহে সোনালী রঙের হিম্যাটিয়নটা পরে তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে ।
এরপর হেফ্যাসটিয়ন আলেকজান্ডারকে নিয়ে কিছুক্ষণ বাগানে ঘুরে বেরাল । রাজকীয় উদ্যানটি খুব সুন্দর ভাবে সাজানো । চারিদিকে বহু বর্ণ বিশিষ্ট অসংখ্য ফুলে ফুলে ভরা ঘাস, গুল্ম, বৃক্ষ ও লতা ছড়িয়ে আছে, বিভিন্ন রকম সুগন্ধে সম্পূর্ণ উদ্যান ভরে আছে । মধু পানের জন্য বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি এদিক ওদিক উরে বেড়াচ্ছে । অনেক রকম ফলের গাছ বিভিন্ন জায়গায় লাগানো । শ্বেত পাথরের বেদি ও সিড়ি যুক্ত স্বচ্ছ জলের সরোবর, পাথরের সুন্দর কারুকার্য করা জলাধার, তা স্বচ্ছ জলে পূর্ণ ও তার মধ্যে বিভিন্ন ফুলের পাপড়ি ছড়ানো । সারি দিয়ে অবস্থিত বহু সংখ্যক বিভিন্ন রকম সুন্দর কারুকার্য করা শ্বেত স্তম্ভ । শ্বেত মর্মরের বহু অনবদ্য মূর্তি বিভিন্ন স্থানে পাথরের বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত, এর মধ্যে আছে গ্রিসে পূজিত দেব দেবীর সুদৃশ্য মূর্তি এবং আরগীড রাজবংশের পূর্বপুরুষ ও বিখ্যাত যোদ্ধাদের মূর্তি । বসার জন্য নির্মিত শ্বেত পাথরের অনেক বেদি, কয়েকটি মার্বেলের স্তম্ভে ঘেরা গম্বুজ যুক্ত ছাদ বিশিষ্ট সুরম্য চাতাল, ভিতরে পাথরের বেদি, সোফা, টেবিল, ক্ষুদ্র জলাধার সাজানো । সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির প্রস্ফুটিত পুষ্পরাশি সবকিছুর শোভা বহুগুণ বৃদ্ধি করছে । কিছু কিছু স্তম্ভ, গম্বুজ ও জলাধারের ওপর সোনা ও রূপার কারুকার্য করা আস্তরণ রাজকীয় বাগানের ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের প্রকাশ । তারা দুজন শ্বেত পাথরের গ্রিক সূর্যের দেবতা অ্যাপোলোর একটি অনবদ্য সুন্দর বিশাল আকৃতির মূর্তির সামনে এসে দাঁড়াল । অ্যাপোলোর সুদৃশ্য মূর্তিটা একটা শ্বেত পাথরের বেদির স্থাপিত । সুঠাম সুন্দর আকর্ষণীয় চেহারার দণ্ডায়মান অ্যাপোলো, তাঁর সম্পূর্ণ অনাবৃত দেহের পিছন দিকে বাঁকাঁধ থেকে ঝোলানো দীর্ঘ ভূমিকে স্পর্শ করে থাকা হিম্যাটিয়ন, ডানকাঁধে ব্রোচ দিয়ে আটকানো । বাঁহাতে ধরে থাকা ধনুক আর ডানহাতে একটা বাদ্যযন্ত্র লাইয়র, যা একটা তার যুক্ত দু বাহু বিশিষ্ট বীণার ন্যায় বাদ্যযন্ত্র, কোমরের ঝোলানো বান ভর্তি তুনীর, যা ডানকাঁধ থেকে কোমরের বাঁদিক পর্যন্ত আটকানো বেল্টের সাথে আটকানো, মাথায় জলপাই পাতার মত ডিজাইন করা মুকুট, সুন্দর করে বিন্যাস্ত চুলের ওপর বসানো । অ্যাপোলো একই সাথে ধনুর্বিদ্যা, সঙ্গীত, কাব্য, ঔষধ, চিকিৎসাবিদ্যা ও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা । রোমেও একই ভাবে পূজিত হন । পাথরের মূর্তিতে তার দেহভঙ্গিমা ও অসাধারণ সুন্দর মুখের ওপর অনবদ্য দিব্য ব্যক্তিত্ব ও অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে । হেফ্যাসটিয়ন আলেকজান্ডারকে বলল," তোমাকে একদম দেবতা অ্যাপোলোর মত লাগছে ।" আলেকজান্ডারকে সত্যিই দেবতাদের মতই অসাধারণ সুন্দর দেখতে এবং সেও তখন অ্যাপোলোর অনুরূপ পোশাক পরেছিল । হেফ্যাসটিয়নও আলেকজান্ডারের ন্যায় অপূর্ব সুদর্শন একজন কিশোর । সে আলেকজান্ডারকে সব সময় অ্যাপোলোর সাথে তুলনা করে ।" অ্যাপোলোও জিউসের পুত্র ", হেফ্যাসটিয়ন বলল । আলেকজান্ডারকে তার মা ওলম্পিয়া দেবরাজ জিউসের পুত্র মনে করেন । এরপর তারা প্রেম ও কামনার দেবতা ইরোসের শ্বেত মর্মরের মূর্তির সামনে এসে দাঁড়াল । মূর্তিটা কিশোরের অবয়বে নির্মিত । ইরোসের বহু ভাস্কর্য শিশু, কিশোর ও যুবকের অবয়বে বানানো হয় । ইনি সৌন্দর্য্য, প্রেম ও কামনার দেবী অ্যাফ্রোডাইটের পুত্র । রোমে পূজিত হন কিউপিড নামে । এনার বস্ত্র, অলঙ্কার অ্যাপোলোর অনুরূপ, ইনি বাঁহাতে ধনুক ও ডানহাতে প্রেমবাণ ধারণ করে আছেন, এই প্রেমবাণে ইনি যাদের বিদ্ধ করেন তারা পরস্পরের প্রেমে অভিভূত হয়ে যায় । এক সুন্দর লাবণ্যময় কিশোর রূপ ইরোস, সুমধুর ও কমনীয় মুখাকৃতি ও অঙ্গসমূহ, সুললিত দেহভঙ্গি, দুটো সুন্দর শ্বেত ডানা যুক্ত । আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নকে বলল," তোমাকে দেবতা ইরোসের মত দেখতে, সবথেকে কমনীয়, লালিত্যময় দেবতা ।"
আলেকজান্ডার একটা গাছের নীচে একটা মার্বেলের বেদির ওপর বসল, হেফ্যাসটিয়ন তাকে একটা সাত তার যুক্ত সোনার লাইয়র এনে দিল । সে অনুরোধ করল তাকে লাইয়র বাজাতে । আলেকজান্ডার লাইয়রটা তার পাশে রেখে মৃদু ধ্বনিতে সুর তুলে বাজাতে শুরু করল, সেই সুরে ক্লান্তি, বিশ্রাম, শান্তি ও মাধুর্য মিশ্রিত ভাব ছিল । হেফ্যাসটিয়ন একটু অন্য দিকে গেল, সে একা আপন মনে লাইয়র বাজাতে থাকল । আলেকজান্ডার একটা তেরো বছর বয়সী কিশোর, মেদহীন কিন্তু রোগা নয়, কমনীয় দেহাবয়ব, তার মধ্যে কিশোর সুলভ কোমলতা আছে, আবার যোদ্ধা সুলভ দৃঢ়তা আছে, কিন্তু তা পরিণত পুরুষের ন্যায় বলিষ্ঠ নয়, কিশোর বয়সের লাবণ্যে ও মাধুর্যে পূর্ণ । তার উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণ, নীল মণির মত সুন্দর দুই চোখ, তীক্ষ্ণ নাক, প্রস্ফুটিত গোলাপের পাপড়ির ন্যায় দুটো ঠোঁট, গালে ও নাকে গোলাপি আভা, সোনালী রঙের ঢেউ খেলানো চুল, গোলাপি হাতের তালু ও আঙুল প্রস্ফুটিত করবী পুষ্পের ন্যায় । সর্বাঙ্গে উজ্জ্বল বর্ণের সাথে ঈষৎ স্বর্ণ ও গোলাপি আভা, যেন বিশুদ্ধ দুগ্ধ, গলিত স্বর্ণ ও শত শত গোলাপের নিঃসৃত ধারায় স্নাত হয়েছে তার দেহ । এই সেই সৌন্দর্য্য যা বার বার প্রশংসিত হয়েছে গ্রিস, রোম ও পারস্যের রাজবংশ ও অভিজাত মহলের দ্বারা আর অবশ্যই একান্ত ভাবে প্রকৃতির দ্বারা । আলেকজান্ডার বসেছিল একটা করবী বৃক্ষের নীচে, যার সমস্ত শাখায় ফুটে ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ অগণিত গোলাপি করবী ফুল আর একটা জুঁই লতা জড়িয়ে ছিল তার সাথে, তার শাখা সমূহ থেকে ঝুলছিল অগণিত সাদা জুঁই ফুলে ভরা লতানো শাখা সমূহ । আলেকজান্ডার লাইয়র ভালই বাজাতে পারে, যদিও তার পরিবার তার রাজনৈতিক ও সামরিক শিক্ষার ওপরই গুরুত্ব দেয়, সৌন্দর্য্য বোধ, সৃজনশীলতা, শিল্পকলার ওপর কখনও দৃষ্টিপাত করেনি । বিকালের মৃদু শীতল হাওয়ায় লাইয়রের সুরের তরঙ্গ উদ্যানময় প্রবাহিত হচ্ছিল, সেই হাওয়ার গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাপি ও সাদা ফুল আলেকজান্ডারের গায়ের ওপর ঝরে পড়ল । একগুচ্ছ ফুল ঝরে পড়ল তার ঊরুসন্ধিতে আর একগুচ্ছ পড়ল তার মাথার ওপর, মুকুটের ন্যায় সুদৃশ্য হয়ে । আজ প্রকৃতি তাকে আবৃত করল নিজ আবরণে, সম্মানিত করল নিজের অলঙ্কারে, যুদ্ধাভ্যাসের জন্য ব্যথিত অঙ্গের ওপর নরম ফুল ঝরিয়ে আরাম প্রদান করল, সুসজ্জিত, সুবাসিত করল নিজ আভরণে, সুগন্ধিতে । হেফ্যাসটিয়ন ফিরে এসে নগ্নদেহী আলেকজান্ডারকে, আপন মনে লাইয়র বাদনরত, পুষ্পে শোভিত, পিঠের ওপর কাঁধ থেকে আলগা ভাবে ঝুলে থাকা হিম্যাটিয়ন, সে এই বস্ত্র তাকে আবৃত করার জন্য দেইনি, দিয়েছিল তার অনাবৃত সৌন্দর্য্যকে সুশোভিত করার জন্য । শ্বেত মর্মরের বেদির ওপর বসে থাকা শ্বেতকায় আলেকজান্ডার, লাইয়রের তারে ছন্দ সৃষ্টিরত, যেন কোনও সুদক্ষ শিল্পীর মার্বেল খোদিত মহান অ্যাপোলোর ভাস্কর্য । সে মন ভরে দেখল নিজের প্রিয় বন্ধুকে । হেফ্যাসটিয়ন এক অসাধারণ সুন্দর কিশোর, যেন স্বর্গ থেকে আগত দেবদূত । আলেকজান্ডারের অনুরূপ দেহাবয়ব, রূপ, লাবণ্য, মাধুর্যে পরিপূর্ণ । কমনীয় মুখ, মনোরম হাসি, তা গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট ও মুক্তার ন্যায় দন্তরাজি শোভিত, নীল মণির মত সুন্দর চোখ, সুগঠিত নাক, সোনালী চুল । উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণ, যেন এক সুন্দর সাদা গোলাপ, সোনালী ও গোলাপি আভায় রঞ্জিত । চাঁদের ন্যায় সুন্দর মুখ, শ্বেতকায় দেহ, শ্বেত বর্ণের চিটোন পরিহিত, যেন চাঁদের শুভ্র জোৎস্নায় আলোকিত । গলায় সোনার কন্ঠহার ও নীল মণি ও মুক্ত খচিত সোনার পেনডেন্ট, কোমরে ও পায়ে সোনার কারুকার্য যুক্ত বেল্ট ও জুতো । সে একগুচ্ছ জলপাই গাছের পাতা ও ফুল আর কিছু সাদা গোলাপ দিয়ে একটা ছোট মালা বানিয়ে এনেছিল, আলেকজান্ডারের কাছে এসে সেটা সে তার মাথায় মুকুটের মত করে পরিয়ে দিল । আলেকজান্ডার খুব খুশি হল, যেন স্বর্গের দেবদূত তাকে সম্মানিত করল । শুধু হেফ্যাসটিয়নের কাছে সে নিজের নমনীয়, সুন্দর গুণাবলী প্রকাশ করতে পারে আর নম্রতা, উদারতা, স্নেহ অনুভব করতে পারে যা তার পরিবারে বিরল । কিছু সময় পর হেফ্যাসটিয়ন একটা রূপার পাত্রে কিছু আঙুর, কমলালেবু, চেরি ও অ্যাপ্রিকট ফল নিয়ে এল । সে জানত যুদ্ধাভ্যাসের পর আলেকজান্ডার কিছুটা ক্ষুধার্ত, বাগান থেকে সংগ্রহ করা ফল জলাধারের বিশুদ্ধ জলে ধুয়ে আর ফলের রস ও মধু মিশ্রিত একপ্রকার পানীয় সে তার জন্য এনেছিল । আলেকজান্ডার স্বানন্দে গ্রহণ করল, হেফ্যাসটিয়নের স্পর্শে যেন সেই ফল আরও মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়েছিল । হেফ্যাসটিয়ন তার সোনার পানপাত্রে পানীয়টা ঢেলে দিল, সেই ফল ও তার বানানো সেই মিষ্টি পানীয় যেন দেবসভার কোনও দেববালকের হাতে পরিবেশিত এমব্রাউসিয়া ও নেকটার গ্রহণ করা । প্রাচীন গ্রিসের প্রচলিত ধারণা ছিল কেউ যদি সুদর্শন হয় তার মধ্যে মহৎ গুণাবলী থাকার প্রবণতা অধিক আর কাউকে দেখতে কুৎসিত হলে সে নিশ্চয়ই খারাপ চরিত্রের । হেফ্যাসটিয়নের মধ্যে পরিপূর্ণ রূপ, লাবণ্যের সাথে সাথে মানবিক উন্নত চরিত্রের গুণাবলী সম্পূর্ণ রূপে ছিল । শুধু প্রচলিত মতেই না সে প্রকৃত পক্ষেই একজন মহান মানব ছিল । খাওয়ার শেষে আলেকজান্ডার হেফ্যাসটিয়নকে অনুরোধ করল লাইয়র বাজাতে," আমি তো বেশি ভাল বাজাতে পারি না, তুমি খুব ভাল পারো, তুমি বাজাও ।" হেফ্যাসটিয়ন বলল," না না তুমি খুব ভাল বাজাও, আমার খুব ভাল লাগে ।" আলেকজান্ডার খুশি হয়ে বলল," আচ্ছা এখন তুমি বাজাও ।" হেফ্যাসটিয়ন লাইয়রটা নিয়ে পাশের গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে লাইয়র বাজাতে শুরু করল, আলেকজান্ডার বিমুগ্ধ হয়ে থাকল । সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটানোর পর হেফ্যাসটিয়ন তার ভবনে ফিরে গেল আর আলেকজান্ডার রাজমহলে ।